লরেন্স কোহলবার্গের নৈতিক বিকাশ তত্ত্ব (Kohlberg’s Theory of Moral Development)
জঁ পিঁয়াজের প্রজ্ঞামূলক বিকাশের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী লরেন্স কোহলবার্গ নৈতিক বিকাশের স্তরভিত্তিক তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, নৈতিক আচরণ নয়, বরং কোনো সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা নৈতিক যুক্তি (Moral Reasoning) শিশুর নৈতিক পরিপক্বতা নির্ধারণ করে।
১. হাইঞ্জের দ্বন্দ্ব (The Heinz Dilemma)
কোহলবার্গ শিশুদের বিভিন্ন নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের গল্প শোনাতেন এবং তাদের যুক্তি বিশ্লেষণ করতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো হাইঞ্জের গল্প (Heinz Dilemma):
- গল্পের সারাংশ: হাইঞ্জের মুমূর্ষু স্ত্রীকে বাঁচাতে এমন একটি বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন ছিল, যার আবিষ্কারক কেমিস্ট ওষুধ তৈরির মূল খরচের দশগুণ বেশি দাম দাবি করে। হাইঞ্জ বহু চেষ্টা করেও ওষুধের পুরো দাম জোগাড় করতে না পেরে বাধ্য হয়ে রাতে দোকানে ঢুকে ওষুধটি চুরি করে।
- মূল উদ্দেশ্য: হাইঞ্জ চুরি করে ঠিক করেছে না ভুল—এই সিদ্ধান্তের চেয়ে কোহলবার্গের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিশুটি উত্তরের পেছনে কী যুক্তি দিচ্ছে (Why)।
- “জেলে যাওয়ার ভয়ে চুরি করা ভুল” এবং “জীবনের মূল্য আইনের চেয়ে বড় তাই চুরি করা ঠিক”—উভয় উত্তর নৈতিক বিকাশের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি স্তরকে নির্দেশ করে।
২. নৈতিক বিকাশের ৩টি পর্যায় ও ৬টি স্তর (3 Levels & 6 Stages)
কোহলবার্গ নৈতিক বিকাশকে ৩টি পর্যায় (Level) এবং প্রতিটি পর্যায়ে ২টি করে মোট ৬টি স্তরে (Stage) বিভক্ত করেছেন:
পর্যায় ১: প্রাক-প্রথাগত পর্যায় (Pre-conventional Morality)
- বয়স: সাধারণত ৯ বছর বয়স পর্যন্ত (প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিক)।
- মূল ভাব: নৈতিকতা সম্পূর্ণরূপে বাহ্যিক ফলাফল ও আত্মকেন্দ্রিকতার (External consequences & Self-interest) ওপর নির্ভরশীল। ঠিক-ভুলের নিজস্ব কোনো বোধ তৈরি হয় না।
- স্তর ১: শাস্তি ও বাধ্যতামূলক অভিমুখিতা (Punishment and Obedience Orientation)
- শিশু কেবল শাস্তি এড়াতে নিয়ম মানে।
- যুক্তি: “নিয়ম ভাঙলে শাস্তি পাব, মার খাব—তাই নিয়ম মানব।”
- স্তর ২: ব্যক্তিগত স্বার্থ ও পারস্পরিক বিনিময় (Instrumental Purpose and Exchange)
- আত্মস্বার্থ ও আদান-প্রদানের মানসিকতা (“You scratch my back, I’ll scratch yours”)।
- যুক্তি: “তুমি আমাকে টিফিন দিলে আমিও তোমাকে পেন্সিল দেব।” নিজের লাভ হলেই কাজটি সঠিক।
পর্যায় ২: প্রথাগত পর্যায় (Conventional Morality)
- বয়স: বয়ঃসন্ধিকাল এবং অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি।
- মূল ভাব: নৈতিকতা নির্ভর করে সামাজিক অনুমোদন ও আইনকানুনের (Social approval & Social order) ওপর।
- স্তর ৩: ভালো ছেলে / ভালো মেয়ে অভিমুখিতা (Good Boy / Nice Girl Orientation)
- পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের চোখে ভালো সাজা এবং তাদের প্রশংসা ও অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা।
- যুক্তি: “আমি মিথ্যা বলব না, কারণ মা ও শিক্ষক আমার ওপর ভরসা করেন; তাঁদের অসন্তুষ্ট করতে চাই না।”
- স্তর ৪: আইন ও শৃঙ্খলা অভিমুখিতা (Law and Order Orientation)
- সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়ম ও আইন মানা বাধ্যতামূলক বিবেচনা করা।
- যুক্তি: “আইন সবার মেনে চলা উচিত; সবাই আইন ভাঙলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।” (অধিকাংশ নাগরিক এই স্তরে অবস্থান করেন)।
পর্যায় ৩: উত্তর-প্রথাগত পর্যায় (Post-conventional Morality)
- বয়স: কিছু সংখ্যক কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক (অনেকে সারাজীবনেও এই স্তরে পৌঁছাতে পারেন না)।
- মূল ভাব: নৈতিকতা নির্ভর করে ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচিত নৈতিক নীতি ও সার্বজনীন মানবাধিকারের (Internalized ethical principles) ওপর। এখানে আইনকেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে পরিবর্তনশীল ভাবা হয়।
- স্তর ৫: সামাজিক চুক্তি ও ব্যক্তিস্বার্থ (Social Contract and Individual Rights)
- আইন হলো সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তৈরি একটি চুক্তি। আইন যদি মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, তবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তা পরিবর্তন করা উচিত।
- উদাহরণ: স্বাধীনতা সংগ্রাম, বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন।
- স্তর ৬: সার্বজনীন নৈতিক নীতি (Universal Ethical Principles – বিরলতম স্তর)
- নিজস্ব বিবেক ও সার্বজনীন মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের নীতি দ্বারা পরিচালিত হওয়া—প্রয়োজনে যা প্রচলিত আইনেরও ঊর্ধ্বে।
- যুক্তি: “আইনের চেয়ে মানুষের প্রাণের মূল্য অনেক বেশি।” (গান্ধীজি, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নৈতিক যুক্তি)।
৩. কোহলবার্গের তত্ত্বের প্রধান সমালোচনাসমূহ
- ক্যারল গিলিগানের যত্ন বনাম ন্যায়বিচারের নীতি (Carol Gilligan’s Care Ethics Critique):
- গিলিগান অভিযোগ করেন যে কোহলবার্গের গবেষণাটি সম্পূর্ণ পুরুষ-কেন্দ্রিক (Male sample) ছিল।
- নারীরা সাধারণত সম্পর্ক, দায়িত্ব এবং সহমর্মিতার দিক থেকে যুক্তি বিচার করে (Ethic of Care); অন্যদিকে পুরুষরা মূলত বিমূর্ত আইন ও নিয়মের ভিত্তিতে যুক্তি দেয় (Ethic of Justice)। কোহলবার্গের মডেলে নারীদের মূল্যায়ন ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের দেখানো হয়েছে।
- সাংস্কৃতিক পক্ষপাত (Cultural Bias):
- সার্বজনীন নীতি (স্তর ৬) মূলত পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; ভারতীয় সমাজের ‘ধর্ম’ বা যৌথ সামাজিক মূল্যবোধকে এটি যথাযথ স্থান দেয়নি।
- যুক্তি বনাম আচরণের ফাঁক (Reasoning vs. Behavior Gap):
- নৈতিক যুক্তি দেওয়া আর বাস্তব জীবনে নৈতিক আচরণ করার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। উচ্চ স্তরের যুক্তি জানা সত্ত্বেও অনেকে চাপে পড়ে অনৈতিক কাজ করতে পারে।
৪. শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ভূমিকা
- শিশুর স্তর অনুযায়ী আচরণ নিয়ন্ত্রণ: প্রাথমিক স্তরে (স্তর ১ ও ২) দীর্ঘ উপদেশের বদলে স্পষ্ট নিয়ম ও পুরস্কার কাজ করে।
- নৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা (Dilemma Discussions): উচ্চ-প্রাথমিক স্তরে বিভিন্ন বাস্তবমুখী নৈতিক সমস্যা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মুক্ত আলোচনার সুযোগ করে দিলে শিশুদের নৈতিক যুক্তি উন্নত হয়।
- যৌথভাবে নিয়ম তৈরি: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রেণিকক্ষের নিয়ম তৈরি করলে তারা সেটিকে শাস্তির ভয় (স্তর ১) না ভেবে সামাজিক দায়িত্ব (স্তর ৪) হিসেবে গ্রহণ করে।
- জেন্ডার পক্ষপাতমুক্ত থাকা: কোনো সিদ্ধান্তকে কেবল কাঠখোট্টা নিয়ম (Justice) দিয়ে বিচার না করে সহমর্মিতা ও যত্নের (Care) দৃষ্টিভঙ্গিকেও সমান মূল্য দেওয়া।
৫. পরীক্ষার ৪টি কমন প্যাটার্ন ও নির্দেশিকা
- Stage & Level সনাক্তকরণ:
- আত্মকেন্দ্রিক / শাস্তি এড়ানো / বিনিময় →Pre-conventional (Stage 1 & 2)
- প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা / সমাজের আইন মানা →Conventional (Stage 3 & 4)
- আইনের চেয়ে জীবন বড় / সার্বজনীন মানবিক নীতি →Post-conventional (Stage 5 & 6)
- Carol Gilligan-এর সমালোচনা:
- জেন্ডার পক্ষপাত ও নারী নৈতিকতাকে অবমূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর সরাসরি: Carol Gilligan এবং তাঁর ধারণা হলো Ethic of Care।
- Heinz Dilemma-র উদ্দেশ্য:
- এটি কোনো সঠিক বা ভুল উত্তরের পরীক্ষা নয়; এটি শিশুর যুক্তি দেওয়ার ধরন (Moral Reasoning) পরিমাপের পদ্ধতি।
- তত্ত্বের মূল অবদান:
- প্রজ্ঞামূলক পরিপক্বতার (Cognitive maturity) সঙ্গে নৈতিক পরিপক্বতার (Moral maturity) সংযোগ স্থাপন করা।
Leave a Reply