বাংলা ব্যাকরণে বাক্য গঠনে এবং শব্দের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে ‘কারক’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। অনেক সময় আমরা সঠিক শব্দ ব্যবহার করলেও ব্যাকরণগত বিন্যাসের অভাবে বাক্য ভুল হয়ে যায়। বাক্যের অর্থ পরিষ্কার করতে এবং পদের সঠিক সম্পর্ক বুঝতে কারক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক।
কারক কাকে বলে?
বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সাথে নামপদ বা বিশেষ্য/সর্বনাম পদের যে সম্পর্ক তাকে কারক বলে। সহজ কথায়, একটি বাক্যে যে কাজটি সম্পন্ন হয় (ক্রিয়া), তার সাথে অন্য শব্দগুলোর (বিশেষ করে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের) যে নানা ধরনের সম্পর্ক বা যোগসূত্র থাকে, তাকেই কারক বলা হয়।
ব্যাকরণিক সংজ্ঞা: বাক্যের অর্থ পরিষ্কার করার জন্য ক্রিয়াপদের সাথে বিশেষ্য ও সর্বনাম পদের যে সম্পর্কযুক্ত রূপ তৈরি হয়, তাকে কারক বলে।
উদাহরণ:
- রহিম স্কুল থেকে কলম দিয়ে চিঠি লিখছে।
এখানে মূল কাজ বা ক্রিয়া হলো ‘লিখছে’। এই লেখার কাজের সাথে রহিম, স্কুল, কলম এবং চিঠির এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কগুলোর নামই হলো কারক।কারক কত প্রকার ও কী কী?
বাংলা ব্যাকরণে কারক মূলত ছয় প্রকার। নিচে কারকগুলোর নাম দেওয়া হলো:
- কর্তৃকারক
- কর্মকারক
- করণকারক
- সম্প্রদানকারক
- অপাদানকারক
- অধিকরণকারক
৬ টি কারকের বিস্তারিত আলোচনা ও চেনার সহজ উপায়
খুব সহজেই কারক চেনার জন্য প্রতিটি কারকের নিজস্ব কিছু প্রশ্ন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো:
১. কর্তৃকারক
বাক্যে যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ নিজে নিজে বা স্বাধীনভাবে ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে কর্তৃকারক বলে।
- চেনার উপায়: ক্রিয়াকে ‘কে’ বা ‘কারা’ দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, তা-ই কর্তৃকারক।
- উদাহরণ: পাখিরা আকাশে উড়ছে। (প্রশ্ন: কারা উড়ছে? উত্তর: পাখিরা — এটি কর্তৃকারক)।
২. কর্মকারক
কর্তা যাকে বা যা আশ্রয় করে ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে কর্মকারক বলে। অর্থাৎ, যার ওপর ক্রিয়ার ফল এসে পড়ে।
- চেনার উপায়: ক্রিয়াকে ‘কী’ বা ‘কাকে’ দিয়ে প্রশ্ন করলে কর্মকারক পাওয়া যায়।
- উদাহরণ: আমি বই পড়ছি। (প্রশ্ন: কী পড়ছি? উত্তর: বই — এটি কর্মকারক)।
৩. করণকারক
‘করণ’ শব্দের অর্থ যন্ত্র, সহায় বা মাধ্যম। যার সাহায্যে বা মাধ্যমে কর্তা ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে করণকারক বলে।
- চেনার উপায়: ক্রিয়াকে ‘কী দ্বারা’ বা ‘কিসের সাহায্যে’ প্রশ্ন করলে করণকারক পাওয়া যায়।
- উদাহরণ: সে কলম দিয়ে লেখে। (প্রশ্ন: কিসের সাহায্যে লেখে? উত্তর: কলম দিয়ে — এটি করণকারক)।
৪. সম্প্রদানকারক
যাকে স্বত্বত্যাগ করে বা কোনো কিছু ফিরিয়ে নেওয়ার আশা না করে দান, সাহায্য বা উপহার দেওয়া হয়, তাকে সম্প্রদানকারক বলে।
- চেনার উপায়: স্বত্বত্যাগ বা নিঃস্বার্থভাবে কিছু প্রদান বোঝাতে ‘কাকে’ বা ‘কাহাকে’ দিয়ে প্রশ্ন করলে এটি পাওয়া যায়। (আধুনিক ব্যাকরণে অনেক সময় এটিকে কর্মকারক হিসেবে ধরা হলেও ঐতিহ্যগতভাবে এটি আলাদা)।
- উদাহরণ: দরিদ্রকে ভিক্ষা দাও। (এখানে নিঃস্বার্থভাবে দান করা বোঝাচ্ছে)।
৫. অপাদানকারক
যাহা থেকে কিছু বিচ্যুত, জাত, বিরত, উৎপন্ন, ভীত বা রক্ষিত হয় এবং যা দেখে কেউ কোথাও থেকে পালায়, তাকে অপাদানকারক বলে। সহজ কথায়, কোনো কিছু থেকে কছু চ্যুতি বা দূরত্ব তৈরি হওয়া।
- চেনার উপায়: ক্রিয়াকে ‘কোথা থেকে’ বা ‘কাহাত্থেকে’ প্রশ্ন করলে অপাদানকারক পাওয়া যায়।
- উদাহরণ: গাছ থেকে পাতা পড়ে। (গাছ থেকে পাতা বিচ্যুত বা আলাদা হচ্ছে — এটি অপাদানকারক)।
৬. অধিকরণকারক
যে স্থান, কাল বা বিষয়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তাকে অধিকরণকারক বলে।
- চেনার উপায়: ক্রিয়াকে ‘কোথায়’, ‘কখন’ বা ‘কোন বিষয়ে’ প্রশ্ন করলে অধিকরণকারক পাওয়া যায়। স্থান, সময় বা ক্ষেত্র বোঝাতে এটি ব্যবহূত হয়।
- উদাহরণ: পুকুরে মাছ আছে। (কোথায় আছে? পুকুরে — এটি অধিকরণকারক)। এছাড়া, সকালে সূর্য ওঠে (সময় বোঝাচ্ছে — অধিকরণ)।